ডেস্ক রিপোর্ট, টুডে বাংলা নিউজ ২৪ ||
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যয়বৃদ্ধি, দুর্নীতির অভিযোগ ও তদন্তের দাবি।দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলেও এর ব্যয়, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ায় এটি ভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় প্রতিবেশী ভারতসহ এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মিত ভারতের তামিলনাড়ুর কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় রূপপুরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রূপপুরে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৯.৩৬ সেন্ট, যেখানে কুদানকুলাম প্রকল্পে তা প্রায় ৫.৩৬ সেন্ট। একইভাবে কিলোওয়াটপ্রতি নির্মাণ ব্যয়ও রূপপুরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।বিশ্ব পরমাণু খাতের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় সাধারণত কিলোওয়াটপ্রতি ১,৫০০ থেকে ৫,০০০ ডলারের মধ্যে থাকলেও রূপপুর প্রকল্পে তা প্রায় ৫,৮৯০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে এ প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও বারবার সামনে আসছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে ব্যয় বৃদ্ধি, অস্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ব্যয়ের বিস্তারিত কাগজপত্র সরবরাহে অনীহা দেখাচ্ছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটম যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, রূপপুরে উৎপাদিত বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হলেও তা পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত ব্যয় ও উৎপাদন খরচ পরিষ্কার না হলে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।অন্যদিকে, প্রকল্প ঘিরে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে আর্থিক অনিয়ম ভূমিকা রাখতে পারে।এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, বড় প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি মানেই দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রূপপুর প্রকল্পে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে জবাবদিহিতা সংকট আরও বাড়বে।”বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্পটির অর্থায়নের বড় অংশই বিদেশি ঋণের মাধ্যমে হওয়ায় এর আর্থিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বহন করতে হবে। জানা গেছে, মোট ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ ঋণ হিসেবে রাশিয়া থেকে নেওয়া হয়েছে, যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।এদিকে রূপপুর কেন্দ্রের একটি ইউনিটে ইতোমধ্যে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী আগস্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে, যা ধীরে ধীরে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে।তবে প্রকল্পটি নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রূপপুর প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয়, উৎপাদন দক্ষতা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারলে এটি দেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।