ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
Today বাংলা নিউজ

গৌরনদীর ‘আল্লাহর মসজিদ’ রহস্য আর ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কসবা গ্রামে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন “আল্লাহর মসজিদ”। বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক থেকে কিছুটা ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে লালচে ইট ও পাথরের কারুকাজে নির্মিত নয় গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন স্থাপনা। শত শত বছর পেরিয়েও রহস্যময়তা আর ঐতিহ্যের আবহ হারায়নি মসজিদটি। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসেন এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি একনজর দেখতে এবং মানত পূরণ করতে।স্থানীয়দের কাছে এটি “আল্লাহর মসজিদ” নামেই অধিক পরিচিত। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকদের মতে, এটি সুলতানি আমলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর একটি। বর্গাকার আকৃতির এই মসজিদটি মূলত বাগেরহাটের বিশ্ব ঐতিহ্য ষাট গম্বুজ মসজিদের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।মসজিদের স্থাপত্যশৈলী দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। কষ্টিপাথর ও বেলেপাথরের চারটি বিশাল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে পুরো কাঠামোটি। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে তিনটি করে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। ভেতর ও বাইরের দেয়ালে খোদাই করা রয়েছে ফুল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশা, যা মধ্যযুগীয় বাংলার শিল্পরুচি ও নির্মাণ দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে।যদিও মসজিদটিতে কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি, ফলে এর সঠিক নির্মাণকাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষকদের ধারণা, প্রায় ৭০০ বছর আগে প্রখ্যাত সুফি সাধক খান জাহান আলী (রহ.)-এর সময়কালে এটি নির্মিত হয়েছিল। স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ উপকরণের সঙ্গে খান জাহান আলীর আমলের অন্যান্য স্থাপনার মিল থাকায় এমন ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।তবে ইতিহাসের পাশাপাশি লোককথাও ঘিরে রেখেছে মসজিদটিকে। স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে এখনও প্রচলিত রয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনি। অনেকে বিশ্বাস করেন, এটি মানুষের হাতে নির্মিত নয়; বরং এক রাতেই অলৌকিকভাবে মসজিদটি দৃশ্যমান হয়েছিল। আবার কারও দাবি, মসজিদের পাথরের স্তম্ভগুলো থেকে একসময় রহস্যময় তেল বের হতো, যা বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে কার্যকর ছিল বলে মানুষের বিশ্বাস।স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বহু বছর আগে দূর-দূরান্ত থেকে অসুস্থ মানুষজন এখানে এসে সেই তেল সংগ্রহ করতেন। অনেকেই মনে করতেন, এই তেল ব্যবহারে দুরারোগ্য ব্যাধিও সেরে যায়। যদিও এসব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ নেই, তবুও মানুষের বিশ্বাস আজও অটুট রয়েছে।মসজিদের বর্তমান খাদেম বাবুল ফকির বলেন, মানুষের গভীর ভক্তি ও বিশ্বাস থেকেই এসব গল্পের জন্ম হয়েছে। একসময় মানুষ নিজেরাই পিলারে তেল মাখতেন। পরে লোকমুখে সেটিই অলৌকিক তেল হিসেবে প্রচার পায়।মসজিদ সংলগ্ন বিশাল পুকুরটিকেও ঘিরে রয়েছে নানা রহস্যময় কাহিনি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকশ বছর আগে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান বা ওয়াজ মাহফিলের জন্য থালা-বাসনের প্রয়োজন হলে পুকুরের পাড়ে গিয়ে প্রার্থনা করলেই অলৌকিকভাবে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পানিতে ভেসে উঠত। তবে এক ব্যক্তির অসাধুতা ও চুরির কারণে সেই অলৌকিক ঘটনা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় বলে বিশ্বাস করা হয়।বর্তমানে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে কসবা গ্রামের এই ঐতিহাসিক মসজিদ প্রাঙ্গণ। কেউ আসেন ইতিহাসের টানে, কেউবা আত্মিক প্রশান্তির খোঁজে। মানত পূরণে অনেকে নিয়ে আসেন গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, মোমবাতি ও আগরবাতি। দূর-দূরান্ত থেকে আসা নারীদের জন্যও এখানে নামাজ আদায়ের সুব্যবস্থা রয়েছে।মানত পূরণ করতে আসা আছমা বেগম বলেন, নাতি অসুস্থ হওয়ার পর এখানে মানত করেছিলাম। আল্লাহর রহমতে সে সুস্থ হয়েছে। তাই আজ নাতিকে সঙ্গে নিয়ে শুকরিয়া আদায় করতে এসেছি। এখানে এলে মনে এক ধরনের শান্তি অনুভব হয়।ইতিহাসবিদদের কাছে এটি প্রাচীন বাংলার সুলতানি ঐতিহ্যের মূল্যবান নিদর্শন, আর সাধারণ মানুষের কাছে এটি পরম করুণাময়ের রহমতের প্রতীক। ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব মিশেলে গৌরনদীর কসবা গ্রামের এই “আল্লাহর মসজিদ” আজও মানুষের মনে বিস্ময় ও ভক্তির জন্ম দেয়। এটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।

গৌরনদীর ‘আল্লাহর মসজিদ’ রহস্য আর ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন